আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় নিয়ে এ বছর বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ব্যক্তি করদাতাদের রিটার্ন জমার শেষ দিন ছিল ৩০ নভেম্বর, যাকে “কর দিবস” বলা হতো। অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে এই একক শেষ তারিখ আর নেই। এখন পুরো করবর্ষজুড়ে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়, তবে কখন জমা দিচ্ছেন তার ওপর কর ছাড় বা অতিরিক্ত কর নির্ভর করে। এই লেখায় আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময়ের নতুন নিয়ম ও অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিলের ধাপ সহজভাবে দেওয়া হলো।
সংক্ষেপে: আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় (২০২৬-২৭ করবর্ষ)
| রিটার্ন জমার সময় | ফলাফল |
|---|---|
| ১ জুলাই – ৩০ সেপ্টেম্বর | প্রদেয় করের ৫% বা ২৫,০০০ টাকা, যেটি কম, তা কর ছাড় |
| ১ অক্টোবর – ৩১ ডিসেম্বর | কোনো ছাড় নেই, অতিরিক্ত করও নেই |
| ১ জানুয়ারি – ৩১ মার্চ | প্রদেয় করের ২% বা ৩,০০০ টাকা, যেটি বেশি, তা অতিরিক্ত কর |
| ১ এপ্রিল – ৩০ জুন | প্রদেয় করের ৫% বা ৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি, তা অতিরিক্ত কর |
তাই অতিরিক্ত কর এড়াতে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়াই নিরাপদ।
আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময়ে কী পরিবর্তন হলো
আয়কর আইন, ২০২৩-এ ব্যক্তি করদাতার রিটার্ন জমার নির্দিষ্ট দিন ছিল ৩০ নভেম্বর। অর্থ আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৯৬ নং আইন) এই একক তারিখ তুলে দিয়ে রিটার্ন জমার সময়কে চারটি ভাগে সাজিয়েছে।
উদ্দেশ্য হলো করদাতাদের আগেভাগে রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করা। যারা করবর্ষের প্রথম তিন মাসে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) জমা দেন, তারা কর ছাড় পান। আর যারা দেরিতে জমা দেন, তাদের অতিরিক্ত কর দিতে হয়।
এখানে “প্রদেয় কর” মানে উৎসে কাটা কর ও অগ্রিম কর বাদ দিয়ে রিটার্নের সঙ্গে যে কর দিতে হয়। কারও প্রদেয় কর শূন্য হলে ছাড় বা অতিরিক্ত করের হিসাবও সেই অনুযায়ী হবে।
কারা আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন
- যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার বেশি।
- যাদের টিআইএন আছে এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক (যেমন নির্দিষ্ট সেবা নিতে রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগে)।
- সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী, যাদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী রিটার্ন প্রযোজ্য।
আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও টিআইএন থাকলে “শূন্য” কর দেখিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া ভালো। এতে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (PSR) পাওয়া যায়, যা ব্যাংক ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স ও বিভিন্ন সেবায় কাজে লাগে।
অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিলের নিয়ম
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিসিয়াল ই-রিটার্ন সাইট etaxnbr.gov.bd-এ যান।
- টিআইএন নম্বর এবং নিজের এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন। মোবাইলে আসা কোড দিয়ে যাচাই করুন।
- লগইন করে করবর্ষ ২০২৬-২৭ বেছে নিন। আয়, সম্পদ, দায় ও বিনিয়োগের তথ্য দিয়ে রিটার্ন ফরম পূরণ করুন।
- কর দিতে হলে অনলাইনে ব্যাংক কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিশোধ করুন।
- রিটার্ন জমা দিয়ে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (acknowledgement) ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন।
নির্ধারিত সময়ের পরে আয়কর রিটার্ন দিলে কী হবে
৩০ জুনের মধ্যেও কেউ বাধ্যতামূলক রিটার্ন জমা না দিলে তা বিলম্বিত রিটার্ন হিসেবে ধরা হয়, এবং আরও বেশি অতিরিক্ত কর বা জরিমানার বিধান আছে। কর কর্মকর্তার নোটিশের পর রিটার্ন দিলে জরিমানার হার আরও বেশি হয়। তাই আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় নিয়ে নিশ্চিন্ত না থেকে আগেভাগেই রিটার্ন জমা দিন।
বিদেশে থাকা ও নতুন করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা
প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারী এবং উচ্চশিক্ষা বা কাজের জন্য বৈধ ভিসায় বিদেশে থাকা করদাতাদের জন্য আলাদা সময়সীমার বিধান আছে। যেমন, দেশে ফেরার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমার সুযোগ। আপনার ক্ষেত্রে কোনটি প্রযোজ্য তা নিশ্চিত হতে কর অঞ্চলের হেল্পডেস্ক বা একজন আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
আয়কর রিটার্ন জমার আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
- বেতনের সনদ বা আয়ের হিসাব, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ব্যাংক সুদের সনদ।
- উৎসে কর কাটার সনদ (যেমন বেতন, সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংক সুদ থেকে)।
- বিনিয়োগের প্রমাণ (সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবনবিমা, শেয়ার) যাতে বিনিয়োগ ভাতার রেয়াত নেওয়া যায়।
- সম্পদ ও দায়ের তালিকা (জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ঋণ)।
সাধারণ প্রশ্ন
৩০ নভেম্বর কি এখনো আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময়?
না। ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে ব্যক্তি করদাতার জন্য ৩০ নভেম্বরের একক শেষ তারিখ নেই। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিলে অতিরিক্ত কর লাগে না, এরপর জমা দিলে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত কর যোগ হয়।
আয় না থাকলেও কি রিটার্ন দিতে হবে?
টিআইএন থাকলে এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন বাধ্যতামূলক হলে শূন্য কর দেখিয়ে রিটার্ন দিতে হয়। অনলাইনে ই-রিটার্নে এটি সহজেই করা যায়।
ই-রিটার্নে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করব?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন সাইটের হেল্পলাইন বা নিজের কর অঞ্চলের করদাতা সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
তথ্যসূত্র: অর্থ আইন, ২০২৬ (bdlaws.minlaw.gov.bd), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (nbr.gov.bd)। এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। নিজের ক্ষেত্রে সঠিক হিসাবের জন্য এনবিআর-এর সর্বশেষ পরিপত্র দেখুন বা আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।






